..:: বিজ্ঞাপন ::..

 

।। দিনেশ দেবনাথ।।

আগরতলা, ১০ মার্চ।। ‘ফাগুনের মুকুল জাগা দু’কূল ভাঙা’ ফুলেল বান প্রায় স্তিমিত, পলাশ-শিমুলের বন আলো করা রক্তরাগ কিছুটা মলিন, কোকিল ডেকে ডেকে ক্লান্ত, অপেক্ষা করতে করতে ফাগুনও প্রায় শেষ, নির্বাচনী কর্মকান্ডের জেরে আমাদের বৌদ্ধিক জগতের বাসন্তী উৎসব বইমেলা হয়ে গেছে বিলম্বিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘হৃদয়ের এ কূল ও কূল দুকূল ভেসে’ যাওয়া নান্দনিক অনুভবের স্রোত বেয়ে আমাদের মননের দুয়ারে হাজির হয়েছে ৩১তম আগরতলা বইমেলা। আগামী ১৭ই মার্চ থেকে শুরু হয়ে চলবে বারোদিন। দীর্ঘ অপেক্ষার রুদ্ধ আবেগের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে ভাসছেন রাজ্যের বই প্রেমীরা।

১৯৮১ সালের মার্চ মাসে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় রাজ্যের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক মহোৎসব – বইমেলা- এক তাৎপর্যপূর্ণ ভিন্নতর পরিপ্রেক্ষিতে। মাত্র দু’বছর আগে অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে রাজ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষের মুখের ভাষা ‘ককবরক’ এই প্রথম সরকারীভাবে রাজ্য ভাষার স্বীকৃতি পেয়ে নতুন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ভাসছে। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের বিনোদন আসি-আসি করছে। নবগঠিত লোকরঞ্জন শাখাগুলোকে কেন্দ্র করে গ্রামে গ্রামে শুরু হয়েছে লোকজ সংস্কৃতির পরিপোষণ ও বিকাশ। অন্যদিকে মাত্র এক বছর আগে ১৯৮০ সালে জাতি-উপজাতির হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িক বিভৎসায়। এহেন ভালয়-মন্দয় মেশানো এক ক্লান্তি লগ্নে আগরতলা বইমেলার যাত্রা শুরু। ত্রিপুরার জাতি-উপজাতি মৈত্রীর সেতু তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী দশরথ দেবের হাতে হয় প্রথম বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। সেদিন অবিশ্বাস-অনৈক্যের চোরাবালিতে দীর্ণ আমাদের মগ্ন চৈতন্যে শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে মানবিকতা বোধের নতুন দিশা দেখিয়েছিল প্রথম আগরতলা বইমেলা।

তারপর ‘দিনে দিনে বাড়ে’ বইমেলা। শচীন কর্তার পুরোনো বাস্তুভিটের রবীন্দ্র ভবনের ছোট্ট চত্বর ছেড়ে পা পড়ে শিশু উদ্যানের বৃহত্তর পরিসরে। এখানেও আজ ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ অবস্থা। কারণ প্রথম বইমেলার চব্বিশটি ষ্টলের পরিবর্তে স্থানীয়, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লী সহ দেশের অন্যান্য স্থান এমনকি বাংলাদেশ মিলিয়ে আজ বই-এর ষ্টলের সংখ্যা দেড়শোর বেশী। প্রথম বইমেলায় সরকারী-বেসরকারী ২০% ভর্তূকীর সুযোগ নিয়ে বই বিক্রী হয়েছিল ৫ লক্ষ ৮৭ হাজার ১৮৪ টাকা। ১৯৯৬ সাল থেকে তুলে দেওয়া হয় ভর্তূকী। কিন্তু ইতিমধ্যেই ত্রিপুরার পাঠক মজে গেছে বই-এর প্রেমে। তার প্রমাণ ভর্তূকীর বছরগুলোর তুলনায় ভর্তূকীহীন বছরগুলোয় বই বিক্রীর পরিমাণ কমে তো নয়ই-বরং প্রতিবছর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে গত বছর ৩০তম বইমেলায় মোট বিক্রীর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে- এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষের ওপর এবং এটা বেড়েছে বিগত কয়েক দশক ধরে প্রকাশনা শিল্পের পাশাপাশি বৈদ্যুতিন মাধ্যম নামীয় প্রবল প্রতিন্দন্দ্বী মাঠে থাকা সত্বেও।

১৯৮১-তে জন্ম নেওয়া শিশুটি আজ ৩১ বছরের পরিণত যুবক। স্থানিকভাবেও বেড়েছে তার ব্যাপ্তি। শীতের প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে ‘শীত মরসুমী’ বইমেলা-উৎসব গত ক’বছর ধরে সব ঋতুতেই রাজ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগে সীমাবদ্ধ ছিল বড় শহরে। এখন জেলা মহকুমা হয়ে বইমেলা চলে গেছে পঞ্চায়েত, এমনকি পাড়া স্তরেও।

এ বছর রুদ্ধ আবেগের বিলম্বিত বইমেলা ১৭ই মার্চ থেকে প্রতি বছরের মতো তার সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে পরবর্তী বারোটি দিনে একটির পর একটি সৌন্দর্যের পাপড়ি খুলে দেবে অগণিত বই প্রেমীদের সামনে। অন্যান্য বছরের মতোই অনুষঙ্গ হিসেবে থাকছে- বর্ণময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বহু ভাষিক কবি সম্মেলন, আলোচনাচক্র, বই প্রকাশ অনুষ্ঠান। আর থাকছে-সেই চিরাচরিত বইকে ঘিরে আড্ডা, তর্ক, উচ্ছ্বাস। থাকছে উদ্যোক্তা-লেখক-পাঠক-শ্রোতা-বিক্রেতা, দর্শক আপামর জনগণের আবেগঘন ভালবাসা, সম্প্রীতি সহযোগিতা। আর এসবের মধ্য দিয়েই সার্থক সফল হয়ে উঠবে রাজ্যের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসব - ৩১তম আগরতলা বইমেলা।